গাড়ি কেনার আগে করনীয়ঃ
গাড়ি কেনার ব্যাপারে আমরা অনেকেই আগ্রহী, যাদের বর্তমানে গাড়ি আছে অথবা নেই তাদের মাঝেও গাড়ির ব্যাপারে অনেক আগ্রহ লক্ষ করা যায়। আমাদের দেশে নানা রকম ব্র্যান্ডের এবং মডেলের গাড়ি আছে এবং এগুলোর বেশিরভাগই রিকন্ডিশন্ড জাপানি গাড়ি। গাড়ি কেনার সময় আমরা যেমন এসবের দিকে আলোকপাত করি,একই ভাবে গাড়িটি কতটুকু টেকসই হবে , কি পব়িমান জ্বালানি খরচ করবে এবং একই ধরনের গাড়ির মাঝে যেটি কিনতে চাচ্ছি সেটির দাম ন্যায্য কিনা সেই দিকেও খেয়াল রাখা জরুরী।পুরাতন গাড়ি হলে নিম্ন লিখিত দিকগুলোর দিকে আলোকপাত করলে গাড়ি কিনে ঠকে যাওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে।
গাড়ির বডি বা চেছিসঃগাড়ির পেছনের বাম্পার থেকে শুরু করে সামনের বোনার্ট এবং বাম্পার পর্যন্ত সব দিকে ভালভাবে দেখতে হবে কোন দাগ আছে কিনা, যদিও ডেন্টিং এবং পেইন্টিং এমন ভাবে করা যায় তা থেকে এর ভেতরে কঠিন কোন ক্ষত বা এটি কতদিন পুরনো তা বোঝা মুশকিল।তবে ডেন্টিং এবং পেইন্টিং কোয়ালিটি যদি ভাল মানের হয়ে থাকে তা হলে পুনরায় একাজটি করাতে যা খরচ হবে তা থেকে অনেকাংশেই রক্ষা পাওয়া যায়।
যদি সম্ভব হয় গড়িটিকে লিফট দিয়ে তুলে নিচের দিকে চেছিসে কোন আকাবাকা নিদর্শন ও লক্ষণ আছে কিনা তা পরীক্ষা করিয়ে নেয়া যেতে পারে।কারন কঠিন কোন দু্র্ঘটনার কবলে গাড়িটি যদি পরে থাকে তা হলে বাক হওয়া চেছিস আর সোজা করা যায় না, ফলে সব সময় বিকট শব্দ শুনতে পাওয়া যায় অথবা স্টিয়ারিং হুইল সঠিকভাবে ঘোরালেও গাড়ি সঠিক দিকে মোড় নিতে পারে না।আসলে গাড়িটির চেছিসে ব্যাবহৃত লোহাটির যদি মারাত্মক ক্ষতির চিহ্ন মেলে তাহলে এটি পুঃন নির্মান বা মেরামতে অতিরিক্ত খরচের কথা বিবেচনা করতে হবে।
গাড়ির ইঞ্জিনঃপুরাতন গাড়ি কেনার সময় এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বা দিক, কারন একটি ইঞ্জিন পরিবর্তন বা ওভারহোল করাতে ১৫০০০০-৫০০০০০ টাকা বা তার চাইতেও বেশী খরচ হতে পারে।ইঞ্জিন ঠাণ্ডা অবস্থায় গাড়িটিকে চালিয়ে দেখতে হবে এটি সহজেই চালু হয় কিনা বা কোন ঝাঁকুনি দেয় কিনা, সঠিকভাবে চালু না হওয় বা ঝাঁকুনি গাড়ির ইঞ্জিন বা ইঞ্জিন মাউনটেনইনের কোন দুর্বলতা নির্দেশ করে। ইঞ্জিন মাউনটেনইন সঠিকভাবে কাজ করছে কিনা সেটি চেক করার জন্য গাড়িটিকে চালু করে ব্রেকে চাপ দিয়ে, রিভা্রস এবং নিউট্রাল গিয়ারে পরিবর্তন করে, এক্সেলেটরে চাপ দিয়ে দেখতে হবে কোন ঝাঁকুনি পরিলক্ষিত হয় কিনা, এরকম সমস্যা অনুভূত হলে মনে রাখতে হবে এর দূরীকরনে ৪০ হাজার বা তার চাইতেও বেশি টাকা খরচ করতে হবে-নির্ভর করে কোন মডেলের গাড়ি তার উপর।ইঞ্জিন অয়েলের কাভারটিকে খুলে ডিপস্টিকের নিচের অংশে দেখতে হবে খুব বেশি কালো, পোরা পোরা বা আলকাতরা জনিত কোন রং দেখা যায় কিনা-এরকম রং ইঞ্জিনের গেসকেটের দুর্বলতা বা ইঞ্জিনের ভেতরের সিলিন্ডার বা ভালবের দুর্বলতা নির্দেশ করে। ইঞ্জিনের ভেতরের সিলিন্ডার বা ভালবের দুর্বলতা জনিত কারনে গাড়ি চালু করার সময় বা পরে অত্যধিক কালো ধোঁয়া গাড়ি থেকে বের হতে পারে। এগুলোর প্রতিস্থাপন বা সার্ভিস করালে অত্যধিক কালো ধোঁয়া থেকে রক্ষা পেলেও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্যে পুরপোরি নতুন ইঞ্জিন প্রতিস্থাপন বা বিদ্যমান ইঞ্জিনকে সম্পূর্ণরুপে ওভারহোল করা বাঞ্ছনীয়।
যদি ডিপস্টিকের রংটি কিছুটা ব্রাউন এবং লালচে কালো দেখায় তা হলে বুঝতে হবে ইঞ্জিনের বর্তমান হাল মোটামোটি ভাল।যদি গড়িটিতে ট্রান্সমিশন অয়েল ব্যবহার করা হয় তা হলে একই প্রক্রিয়ায় পরীক্ষা করে দেখতে হবে।এক্ষেত্রে হালকা লালচে রং স্বাভাবিকতা প্রকাশ করে।
ইঞ্জিন চেক করার সময় ইঞ্জিনের কুলিং সিস্টেম চেক করা জরুরী, যা কাভারটি সরিয়ে এর ভেতরে জমে থাকা পানি চেক করে দেখতে হয়- এটি কোন সাধারন ওয়াটার নাকি ইঞ্জিন কুলেন্ট ব্যাবহার করছে।যদি দীর্ঘদিন সাধারন ওয়াটার ব্যাবহার করে থাকে তা হলে বুঝতে হবে পানির সাধারন পদার্থ যেমন-মিনারেল, খনিজ জমা হয়ে বাতাসের সাধারন প্রবাহে বাধা তৈরী করে কুলিং সিস্টেম বা রেডিয়েটরে দু্র্বলতা তৈরী করেছে। এরকম পরিস্থিতিতে ইঞ্জিন খুব বেশি গরম হয়ে যেতে পারে, অতিরিক্ত ধোঁয়া বা বার্ন সংক্রানত সমস্যার আলামত দিতে পারে।
গাড়ির টায়ারঃ গাড়ির টায়ার পরীক্ষা করার সময় দেখতে হবে এটি কত সালে তৈরীকৃত-উৎপাদন সাল সাধারনত টায়ারের গায়ে লেখা থাকে। বেশি পুরাতন টায়ারের উপরিভাগ অনেক প্লেইন হয় বা
ডোড়াকাটা দাগগুলো সমান হয় যা টায়ারের অকার্যকারিতা প্রকাশ করে। কারন এরকম টায়ার সম্বলিত গাড়ি সহজেই পিচ্ছিল খেয়ে দু্র্ঘটনা ঘটায়। এসব দিকগুলো খেয়াল করা জরুরী কারন নতুন চারটি ভাল মানের চাকা লাগাতে প্রায় ৩০০০০ টাকা বা তার চাইতেও বেশি খরচ হতে পারে।
গাড়ির ভেতরের অংশঃডোর পেনেল এবং রুফ লাইনার চেক করে দেখতে হবে কোন দাগ বা পুরাতনভাব আছে কিনা,এরকম হলে এগুলোকে নতুন করতে বেশ ভালই খরচ করতে হবে।সিটের কাভারে কোন দাগ, ক্ষত বা পুরাতন ভাব থাকলে এগুলোকে নতুন করতেও অতিরিক্ত খরচ করতে হবে।
সম্ভব হলে ছিটের উপরের অংশ খুলে ভেতরে সিটের হালহলিকত যাচাই করা যেতে পারে,কোন ধরনের অযাচিত ক্ষত বা বাকানোভাব দেখা গেলে মনে রাখতে হবে এগুলো ঠিক করাতে ভালই খরচ হবে।উপরে নিচে চেক করে দেখতে হবে এসির ভেনটগুলো ঠিক আছে কিনা,সবগুলো ভেনটে সমহারে বাতাস বা ঠাণ্ডা প্রবাহ থাকলে এসিটির স্বাভাবিকতা প্রকাশ পায়।
ইলেকট্রনিক্সঃ অডোমিটার যা গাড়ির মাইলেজ নির্দেশ করে, কিন্তু এটির ম্যানিপুলেশন করা যায়। তাই বিশ্বস্ত সূত্র না হলে যাচাইকৃত গাড়িটিকে পেইড কোন সার্ভিস নিয়ে চেক করা যেতে পারে।মডেলভদে একটি গাড়ি বছরে কত কিলোমিটার চলা সমীচিন সেই আলোকে চেক করা যেতে পারে, অনেক বেশি বা অনেক কম মাইলেজ গাড়ির বর্তমান হালহলিকত এবং ভবিষ্যৎ পারফর্মেনচের নেতিবাচকতা প্রকাশ করে। এসব ইলেকট্রনিক্স আইটেম ছারাও সিডি প্লেয়ার, এনটিকার্টার, এবিএস সিস্টেম এবং অন্যান্য সুইচগুলো ঠিকভাবে কাজ করছে কিনা সেদিকেও আলোকপাত করা প্রয়োজন। গাড়ির লাইটগুলো দেখতে অনেক পুরাতন দেখায় কিনা,এগুলোতে কোন ফাটল আছে কিনা, জ্বলন্ত অবস্থায় লাইটগুলো ঠিকমত আলো দিচ্ছে কিনা তা যাচাই করতে হবে।গাড়ির ইলেকট্রনিক্সে ছোট পরিসরের কোন সমস্যা সমাধানেও যথেষ্ট খরচ করতে হয়।এসব কিছু চেক করার আগে গাড়ির ব্যাটারির কার্যকারিতা চেক করা শ্রেয়।
এবার গাড়িটিকে আকাবাকা এবং ভাঙ্গা রোডে চালিয়ে এর স্টিয়ারিং হুইল,ব্রেক ঠিকমত কাজ করছে কিনা যাচাই করতে হবে।বিশেষ করে মোড়গুলোতে অতিরিক্ত শব্দ বা ঝাঁকুনি অনুভূত হলে গাড়িটির চেছিস বা ইঞ্জিন মাউনটেইনে কোন দুর্বলতা আছে সেটি বুঝতে হবে। হাই ওয়েতে গাড়ি চালিয়ে দেখতে পারলে সবচেয়ে ভাল হয়, কারন এতে গাড়ি দ্রুত চলাকালীন সময়ে ইঞ্জিন এবং ব্রেকিং সিস্টেম কি রকম পারফর্ম করছে তা যাচাই করা যায়, যদিও এ সুযোগটি অনেকের কাছেই মেলে না।
প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাইঃ টেক্স পেপার, নিবন্ধন পেপার, ফিটনেছ পেপার এবং কিছু গাড়ির ক্ষেত্রে রোড পারমিট পেপার গাড়ি চালানোর সময় সাথে রাখতে হয়, না হলে কত ধরনের বিড়ম্বনার স্বীকার যে হতে হয় তা অনেকেই জানেন অথবা শুনেছেন।এক্ষেত্রে কাগজপত্রের কমপক্ষে ৬ মাস মেয়াদ আছে এরকম গাড়ি কিনলে ভাল।গাড়ির বর্তমান পেপার সম্পর্কিত হালহলিকত জানা যেতে পারে বি আর টি এর ওয়েব সাইট থেকে। একথা সত্যি যে যারা নিজেরা অথবা কারো মাধ্যমে কোন উপায়ে বি আর টি এ থেকে কাগজ করিয়ে নিতে পারেন তাদের গাড়ি কেনার সময় এসব কাগজপত্রের দিকে না খেয়াল করলেও চলে।তবে কাগজপত্র করতে কত খরচ হবে সেই হিসেবটা করা আগে থেকেই জরুরী।
আসলে এলেখাটি গাড়ি নিয়ে যারা ব্যবসা করেন, যারা মেকানিক্সসহ ড্রাইভিং লাইসেনস করছেন বা করেছেন,গাড়ি নিয়ে কোন প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন করছেন বা করেছেন অথবা অন্য যেকোন উপায়ে গাড়ির মেকানিক্স সম্পর্কে সম্যক ধারনা অর্জন করেছেন তাদের জন্য উপযোগী এবং সহজবোধ্য।
তবে পরবর্তী লেখায় বর্তমানে বাজারে যে গাড়িগুলো পাওয়া যায় তাদের দাম এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় বিষগুলো বিভিন্ন বই এবং ইন্টারনেট লিংকসহ তুলে ধরার প্রয়াস করব যাতে গাড়িতে আগ্রহী সকলে সাচ্ছন্দে গাড়ি ক্রয় বা বিক্রয় করতে পারে।




















Comments
Post a Comment